গোঁদের উপর বিষফোড়া আসলে কারা?
– মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক (বিচারপ্রার্থী)
প্রফেসর দিলারা চৌধুরীর সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য বেশ আলোচিত হয়েছে। বক্তব্যে কিছু বেদনাদায়ক শব্দ ব্যবহৃত হওয়াতে আমরা দুঃখ পেয়েছি। তবে বক্তব্যে মূল যে উৎকন্ঠা প্রকাশ পেয়েছে – সেটিকে আমি সঠিক ও সমীচীন মনে করি।
আলাপের মধ্যে ড্রোন, মিসাইল, এয়ার ডিফেন্সের মতো বিষয়গুলো এসেছে। তাই সম্ভবত উৎকণ্ঠাটি রেগুলার মিলিটারি লজিষ্টিক্স নিয়ে নয় বরং আমাদের জাতীয় পরিসরে দূর্বল মিলিটারি-ইন্ড্রাষ্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স নিয়ে।
আমাদের নিজস্ব ড্রোন, মিসাইল, এয়ার ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি নেই – এটি আমাদের একটি দূর্বলতা। আর এটি শতভাগ সত্য।
তবে এটি সামরিক বাহিনীর কোন ফেইলওর নয় বরং এটি জাতি হিসেবে আমাদের সম্মিলিত ফেইলিওর – আমার মূল বক্তব্য এটি নিয়ে।
কেন এমন বলছি?
কারণ জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শুধু সামরিক বাহিনীর একক নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয় না। এটা পুরো জাতির সক্ষমতার প্রশ্ন!
সামরিক বাহিনী মূলত এ সকল আধুনিক যুদ্ধ সামগ্রীর ব্যবহারকারী বা ইউজার। কিন্তু এর নির্মাতা হলো ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি, রাষ্ট্র হলো এর অন্যতম সংগঠক, পুরো জাতি হলো এর পিছনের শক্তি।
আধুনিক ড্রোন, মিসাইল, এয়ার ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদি শুধু সামরিক বাহিনী একা তৈরি করতে পারে না। এর পিছনে থাকতে হয় — বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ইঞ্জিনিয়ারদের ক্রমাগত টেষ্ট এন্ড ট্রায়াল, বিজ্ঞানীদের গবেষণা, প্রাইভেট ও পাবলিক ইন্ডাস্ট্রি, সরকারি-বেসরকারি ফ্যাক্টরি এবং দেশপ্রেমিক কর্মশক্তি।
সামান্য একটি ড্রোন বানাতে লাগে — ল্যাব, মাইক্রোচিপ, কাস্টম সফটওয়্যার, এআই, বিভিন্ন সেন্সর, বিভিন্ন কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল, মাইক্রো-ইলেকট্রনিক্স এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা। এটি একটি পুরো ইকোসিস্টেম।
একইভাবে নিজেদের ভাল কোয়ালিটি মিসাইল বানাতে লাগবে এর জন্য উপযোগী একটি জাতীয় ইকোসিস্টেম। একই কথা সত্য, এআই ভিত্তিক মিলিটারি টেকনোলজির ক্ষেত্রে।
উদাহরণ হিসেবে দেখুন: আমেরিকার এফ-১৬, এফ-২২, এফ-৩৫ বানায় Lockheed Martin, এম-১ আব্রামস ট্যাংকগুলো বানায় General Dynamics।আমেরিকান সামরিক বাহিনী এগুলো নিজেরা বানায় না।
রাশিয়ার সুখোয় সিরিজ বানায় Sukhoi, একইভাবে জার্মানির লিওপার্ড ট্যাংকের পিছনে আছে Rheinmetall। রাশিয়ান কিংবা জার্মান আর্মি এগুলো বানায় না।
চীন তাদের ড্রোন, মিসাইল, ট্যাংক, ফাইটার ইত্যাদি — রাষ্ট্রীয় ইন্ডাস্ট্রি দিয়ে তৈরী করে।
অর্থাৎ সামরিক বাহিনী একা একটি দেশকে সামরিকভাবে শক্তিশালী বানাতে পারবে না। এর জন্য পুরো জাতিকে এদিকে ভাল লেভেলে মনযোগ দিতে হবে। জাতির শক্তি ও এফোর্ট এর একটি বড় অংশ এদিকে ডাইভার্ট করতে হবে।
তাই আমাদের নিজেদের ড্রোন, মিসাইল, এয়ার ডিফেন্স নেই – এ উৎকণ্ঠা ১০০ ভাগ সঠিক। তবে সেটি সামরিক বাহিনীর ব্যর্থতা নয় বরং এটি আমাদের জাতিগত ও সামষ্টিক ব্যর্থতা।
এজন্য এদেশের রাজনীতিবিদগণ, শিক্ষাবিদ-গবেষকগণ, সামরিক বাহিনী এবং প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ একটি শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন জাতি গঠনে দৃঢ়-সংকল্প হতে হবে। আর সম্ভবত এর জন্য এদেশের অধিকাংশ মানুষই একমত।
এক শ্রেণির মানুষ যারা ভারতীয় আধিপত্যবাদের গোলাম, যারা এদেশকে একটি করদ-রাজ্য বানানোর জন্য কাজ করে – তারা এই শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা অর্জনে বাঁধা সৃষ্টি করে। এরাই হল আসলে আমাদের জাতির গোঁদের উপর বিষফোড়া।
তাই প্রফেসর দিলারা চৌধুরীসহ সকল শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও অন্যান্যদের কাছে অনুরোধ থাকবে – চলুন সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি শক্তিশালী এবং সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন দেশ গড়ে তুলি। এ কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করি।
গোঁদের উপর বিষফোড়া হয়ে যারা এ লক্ষ্য অর্জনে বাঁধা দিবে তাদেরকে চিহ্নিত করি, বয়কট করি, প্রয়োজনে আইনিভাবে তাদেরকে দমন করি।




