শরিফ ওসমান হাদির ইনসাফের রাজনীতি
নিয়াজ আহমদ জাবের
বহুমুখী প্রতিভার তরুন শহীদ – শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন নানা গুনে গুনান্বিত। ছিলেন দার্শনিক, তাত্ত্বিক, তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ সুবক্তা, তার্কিক, অতি সাধারন জীবনমান ধারনকারী উচ্চ মাত্রার এক রাজনীতিবিদ, ধর্মভীরু মৌলানা, আর অসম্ভব বন্ধুবৎসল – সন্তানের বয়সী এক পিতা। পারিবারিকভাবে অত্যন্ত পর্দানশীন হলেও সমাজ জীবনে তিনি ছিলেন মার্জিতভাবে খোলামেলা।
তার সৌন্দর্য ছিল তার গরীবিতে। ইনকিলাব সেন্টার বা মসজিদের ফ্লোরে বিছানা-বালিশ বিহীন ঘুমানোতে। অলিগলিতে ছোট বাচ্চাদের কোলে নিয়ে আদর করাতে। যে কেউ চাইলে সেলফি দিতে। ফজরের নামাজ পড়ে দলবলহীন একা বা দু-তিনজন মিলে রাস্তায় রাস্তায় ভোট চাইতে। ঘুমের অভাবাক্রান্ত ছোট চোখ, ক্রিম না লাগানো আনপলিশড মুখমন্ডল, এলোমেলো ঝাঁকড়া চুল, গড়পড়তা পান্জাবী, মুজা ছাড়া সস্তা জুতা সবকিছুই তাকে দেয় অপার সৌন্দর্য বা বাড়িয়েছে মাহাত্ম্য। ঠিক যেমন কাজি নজরুল বলেছেন, হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছ মহান, তুমি মোরে দানিয়াছ খৃস্টের সন্মান! অনেক প্রতিভা সত্ত্বেও তার মত কজন পারবেন এরকম ত্যাগ করতে?
তার কথার মধ্যে কোন খাদ ছিল না, ভনিতা ছিল না, স্বার্থপরতা ছিল না, অসততা ছিল না। ছিল না কোন উদ্দেশ্য প্রনোদিতা। তিনি যা বলতেন অকপটে বলতেন, তবে সন্মানের সাথে বলতেন। তার কোন বক্তব্যের এক লাইনও অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত ছিল না। এমনকি টকশোর সনচালক তার কথার রেশ টেনে প্রসঙ্গ বদলালেও তিনি আপত্তি না করে অকপটে পরবর্তী প্রশ্নের সাবলীল উত্তর দিতেন। তার বক্তব্য শোনার সময় কোন অবস্থাতেই তা শেষ না করে ওঠা যেত না। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ তথা মানবসমাজের জন্য মহান রব এর এক রহমত স্বরূপ!
তিনি ইনসাফের কথা বলতেন। তার মৃত্যুতে আমরা শোকে পাগল। কিন্তু তার সেই ইনসাফ কি বুকে ধারন করি? আমরা কি বুঝতে চেষ্টা করি সে ইনসাফ কি? তা আইন কানুনের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। কারন, আইন তৈরী হয় শক্তিমান বা সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছায়। তাতে সবসময় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। কিন্তু ইনসাফ হল মহান রব এর নিয়ম। তা পক্ষপাতহীন ও সর্বজন উপকারী। তা আসে বিবেকের সফটওয়্যার থেকে, আর তা ধুলায় লুটায় বিবেকহীনতায়।
সেই ইনসাফের কারনেই হাদি চাইতেন সবার জন্য ন্যায় বিচার। তা শুধু ছোটর জন্যই নয়, বড়র জন্যেও। শুধু গরীবের জন্যই নয়, ধনীর জন্যেও। এমনকি শুধু মজলুমের জন্যেই নয়, জালেমের জন্যও তা প্রযোজ্য। অর্থাৎ যার যা প্রাপ্য তা তাঁকে দিতে হবে। হোক তা শাস্তি বা সন্মান। তবে যেটুকু প্রাপ্য সেটুকুই। বেশি বা কম নয়। এটাই ইনসাফ!
অতি আনুগত্য ও গনতন্ত্র এক পথে চলে না। প্রথমটি বড়-ছোট নির্নায়ক ও দ্বিতীয়টি সমতার ঝান্ডাধারী। প্রথমটি সুযোগ সন্ধানীদের আঁতুড়ঘর, দ্বিতীয়টি সমমনাদের মিলনমেলা। একটি সুবিধা নেয়ার পথ সুগম করে, অন্যটি সুবিধা দেয়ার পথ সৃষ্টি করে। সবাই যার যার ন্যায্য অংশ পায় ও অন্যকে দেয়। তাই হাদি কোন রাজনৈতিক দলে যোগ না দিয়ে ইনকিলাব মন্চ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল তিনি রাজনীতিবিদদের সবক দিবেন। জনগনের হয়ে সবার চোখ খুলে দিবেন। সংসদে গিয়ে ইনসাফের পক্ষে কথা বলবেন। ইনসাফের আইন পাশ করাবেন।
হাদি ছিলেন পরিবারতন্ত্রের বিরোধী। কারন তা যার যার পরিসরে রাজতন্ত্র কায়েম করে। তাই তিনি পরিবারের কাউকেই তার রাজনীতিতে জড়ান নাই। শুধু সহকর্মী ও সহযোদ্ধাদের নিয়েই ছিল তার রাজনীতি। এটা নিশ্চিত যে তিনি জানলে তার মৃত্যুর পরে তার বোনকেও তার জায়গায় নির্বাচনে নামাতে রাজি হতেন না। হয়ত তার কোন সহকর্মী বা সহযোদ্ধাকে সে দায়িত্ব দিতেন। এটাই গনতন্ত্রের ইনসাফ!
১৮ কোটি জনগনের ০১ কোটি আওয়ামী লীগ বা দালাল বাদ দিলে বাকি ১৭ কোটি মানুষ চায় ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে মুক্তি। চায় আমাদের দেশ আমাদের মত চলুক। তাতে বিগ ব্রাদার নাক গলাবে কেন? কেন তারা আমাদের গনতন্ত্রে হস্তক্ষেপ করবে? কেন তারা জোড় করে তাদের পছন্দের সরকার বসাতে চাইবে? আমাদের স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি আমরা সাজাবো। তারা তাতে বাধ সাধবে কেন? আমরা তো তাদের ব্যাপারে ইন্টারফেয়ার করি না! এটাই সার্বভৌমত্বের ইনসাফ!
হাদি ছিলেন বাংলার সক্রেটিস। তাই তথাকথিত এলিট সমাজ তাকে নিয়ে ছিল বিব্রত। চরম শত্রুরা তো তাকে বাঁচতেই দেয় নাই! কারো হাঁটুর সমান বয়স নিয়ে তিনি চ্যালেন্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলতেন, আমি আরো ছোট হলেও আপনাকে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তার কথার ক্ষুরধারে বিধ্বস্ত হয়ে টকশোর সহবক্তারা তার উপর বিরক্ত হতেন। পরাজিত বোধ করতেন। এমনকি কেউ কেউ তার সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ পর্যন্ত মেনে নিতে পারেন নাই। কারো কারো তার প্রতি অবজ্ঞা এত বেশি ছিল যে সংবাদ সম্মেলনে তার নিজের ও সংগঠনের নাম পর্যন্ত সঠিকভাবে বলার প্রয়োজন বোধ করেন নাই। পাশের লোকদের কাছে জিজ্ঞেস করে শেষমেষ ভুলভাবে বলেছেন।
তাই তার মৃত্যুতে কেউ খুশি হয়েছেন কিনা জানি না, তবে এটা নিশ্চিত যে দুঃখ পেয়েছেন এরা সবাই। এটাই প্রকৃতির বিচার। কারন, হাদি সবার অন্তর জয় করে এদের জন্য মাঠ ফাঁকা করে বিদায় নিয়েছেন। কারো প্রতিদ্বন্দ্বী আর থাকেন নাই। এটাই প্রতিপক্ষের জন্য চিরন্তন পরাজয়।
হয়তো তার সময় শেষ হওয়ায় ডাক এসেছিল পরপার থেকে। হয়ত আমরা অশ্রুসিক্ত বিদায় দিলেও শহীদ হাদির জন্য বেহেশতে চলছিল তাকে স্বাগত জানানোর তোড়জোড়। কারন, হাদি অর্থ হেদায়েত বা পথপ্রদর্শকের সেবক। তাই তার যা বলার তা হয়ত বলা হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং, তার দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। বাকি যা আছে তা হল সেই বলা অনুযায়ী করা। আর সে দায়িত্ব পড়েছে আমরা যারা বেঁচে আছি তার অনুভূতি নিয়ে – তাদের উপর। কিন্তু আমরা কি করবো বা পারবো তা?




